❝গল্প লেখার কৌশল❞

লেখাটা “কীভাবে গল্প লিখবো” সেটা নিয়ে নয়। বরং “কীভাবে লিখতে হয়,” তা নিয়ে।

যেমন ধরুন, আপনাকে একটা ঘর বানাতে বলা হলে আপনি কী কী বানাবেন?
মেঝে, চারটা দেয়াল, ছাদ, জানালা, দরজা।

যদি, আপনি খুব সুন্দর করে শুধু চারটা দেয়াল বানালেন। তাকে কী আমরা ঘর বলবো? কিংবা শুধু একটা দরজা বা কয়েকটা জানালা দিয়ে কী ঘর বানানো যায়? যায় না।

যদি গল্প লেখাকে একটা ঘর ভাবি, তাহলে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে এরও একটা মেঝে, চারটা দেয়াল, ছাদ, জানালা আর দরজা আছে। মানে একটা কাঠামো আছে। যেটা ছাড়া একটা “গল্প”, গল্প হয়ে ওঠে না।


ঘরের সাথে তুলনা করলে বলা যায়,

মেঝে হচ্ছে গল্পের প্লট। যার উপর গল্পটা অবস্থান করে।

চারদিকের চারটা দেয়াল হচ্ছে কাহিনি।

ছাদটাকে প্রধান চরিত্র (নায়ক/নায়িকা) ভাবতে পারি।

জানালা হচ্ছে ছোট ছোট চরিত্রগুলো। আর দরজা প্রধান পার্শ্ব চরিত্র।

আর...

ঘরটাকে কত সুন্দরভাবে রং করতে পারবো, কত সুন্দরভাবে সাজাতে পারবো, সেটা হচ্ছে বর্ণনাভঙ্গি বা গল্প বলার ঢং। আর বাকিগুলোর মতো এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমাদের চারপাশে তো হাজারটা ঘরবাড়ি। সবই কি আমাদের নজর কাড়ে? কাড়ে না। সুন্দর ডিজাইন আর সুন্দরভাবে রং করা আর সাজানো ঘরবাড়িই আমাদের নজর কাড়ে।

সুতরাং এটাই হলো সেই বৈশিষ্ট্য যা আপনার গল্পকে আরেকজনের গল্প থেকে পৃথক করে।

এইসব মিলিয়ে হয় একটা গল্প। এবং এদের যেকোনো একটির অনুপস্থিতি গল্পকে জগাখিচুরি বানিয়ে ফেলতে পারে।

যেমন, সবই বানালাম। শুধু জানালা দিলাম না। তাহলে সেটাকে আমরা ঘর বলবো নাকি কয়েদখানা?

আবার একটা ছাদের বদলে দশটা ছাদ বা একটা জানালা দিয়ে পাঁচটা দরজা দিলে কি সেগুলোকে আমরা ঘর বলতে পারি?

মানে, সবই হতে হবে পরিমিত।

অর্থাৎ, একটা গল্পের একটা প্লট থাকবে, তাতে কাহিনি থাকবে। কাহিনিতে প্রধান চরিত্র, পার্শ্ব চরিত্র থাকবে। এদের মাঝে দ্বন্দ্ব থাকবে, থাকবে ক্লাইম্যাক্স বা উত্থানপতন এবং একটি পরিপূর্ণ সমাপ্তি। আর এ সবকিছু থাকবে স্বকীয় বর্ণনাভঙ্গির মোড়কে।

.

গল্পের কাঠামো নিয়ে তো বলা হলো। এবার বলি, লেখালেখিতে প্রথম প্রথম নবীন লেখকদের যেসব ভুল হয়,

১. ভাষাটা অনেক প্যাঁচানো অথবা সহজ হয়। মানে সাহিত্যের ভাষাটা আসে না।

২. বাক্যের শেষে ছন্দ চলে আসে। যেমন,
সে এলো। চলে গেলো। গিয়ে খেলো। খেয়ে বলল, ‘এটা কিছু কি হলো?’

৩. বিরাম চিহ্নের যথেচ্ছা ব্যবহার করে ফেলে। যেমন,
সে এসেছিল,,,,,,তারপর কী অবাক!!!!!....... আমি ভেবেই পাই না।।।।

৪. স্ট্যাটাসের মতো সাহিত্যেও ইমোটিকনের ব্যবহার করে। যেমন,
কী অবাক ব্যাপার! :O আমাকে নাকি সে ভালোবাসে। <3 আমি শুনে একটু হাসলাম। :)

৫. বাংলা সিনেমার মতো কমন প্লটে লেখা। বিশেষ করে রোমান্টিক প্লটের গল্পগুলো।

৬. শেষে এসে খেই হারিয়ে গোঁজামিল দিয়ে শেষ করা বা অসম্পূর্ণভাবে শেষ করা।

৭. অন্যের অনুকরণে লেখা বা লেখনশৈলী নকল করা।

.

#সমাধানসমূহ :

১. ভাষা যদি খুব সহজ, যাকে অপরিপক্ব লেখা বলে, সেটা হয়ে থাকলে নিয়মিত লিখে যেতে হবে। লিখতে লিখতে পরিপক্বতা এসে যাবে।

মাথায় রাখতে হবে, একদিনে কেউ রবীন্দ্রনাথ হয় না।

যদি ভাষা কঠিন বা প্যাঁচানো হয়, সেক্ষেত্রে কঠিন কঠিন শব্দের প্রচলিত প্রতিশব্দ এবং ছোটো ছোটো বাক্যে লেখার অভ্যাস করতে হবে।

২. ছন্দ এড়ানোর সহজ উপায় হচ্ছে লেখার সময় সচেতন থাকা। কিংবা একাধিকবার খসড়া বা ড্রাফট করা। তাহলেই সমস্যাটা এড়ানো যাবে।

৩. বিরাম চিহ্নের যথেচ্ছা ব্যবহার মূলত অজ্ঞতার কারণে হয়। যেমন, অবলোপচিহ্ন বা এলিপস সাইন (...) এ তিনটা করে বিন্দু হয়। এর বেশি বা কম অশুদ্ধ। মূলত বাক্যের অসম্পূর্ণতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। একাধিকবার ব্যবহার করলে এভাবে করতে হবে ... ... ...। মানে তিনটা করে দিয়ে স্পেস।

কোনো বিরাম চিহ্নই পরপর একাধিকবার ব্যবহার করতে হয় না। যেমন,
কী আজব!!!!
এখানে একাধিক আশ্চর্যবোধক চিহ্ন আলাদা কোনো অর্থ বহন করছে না। এরূপ ব্যবহার অশুদ্ধ।

৪. প্রয়োজন ছাড়া গল্প বা কবিতায় ইমোটিকন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

প্রয়োজনটা কখন?
দেখা গেল, গল্পের কাহিনিতে ইনবক্সে কথোপকথন রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাস্তবতা আনতে সেই কথোপকথনে ইমোটিকন আসতে পারে।
কিন্তু অকারণে কখনই আসবে না।

৫. কমন প্লট এড়াতে প্লট বাছাইয়ে সাবধানতা অবলম্বন ভালো সমাধান হতে পারে। যে প্লটে লিখবো বলে ভাবছি, সেই প্লটে আগে কোনো কাজ হয়েছে কিনা, হলেও কীভাবে, কীরকমভাবে— এসব খেয়াল রাখতে হবে।

৬. শেষে এসে খেই হারিয়ে গোঁজামিল দেওয়ার কারণ একটাই, অপরিকল্পিত লেখা। লেখার পূর্বে আমাকে যেমন শুরুটা ভাবতে হবে, তেমন শেষটাও। এজন্য আউটলাইন করে নেওয়া যেতে পারে। কিংবা গল্প লেখার পূর্বে সারমর্ম আকারে লেখাটি লিখে রাখা যেতে পারে। এছাড়াও বারংবার খসড়া বা ড্রাফট করলে লেখা যেমন শাণিত হয় তেমনি সমাপ্তিতেও আসে নতুনত্ব।

৭. দীর্ঘদিন একই ধাঁচের বা একই জনের লেখা পড়লে লেখায় সেটার বা তার ছাপ এসে যায়। এটা এড়াতে সবসময় সবধরনের লেখা পড়তে হয়। একই লেখকের লেখা একনাগাড়ে না পড়ে, বিরতি দিয়ে দিয়ে পড়তে হয়।

মাথায় রাখতে হবে, একজন লেখক খুব ভালো পাঠক। তিনি কেবল গল্পের বই পড়েন না। তিনি শিল্পকলার সব শাখাতেই বিচরণ করেন। তিনি যেমন, গল্প পড়েন, তেমনি বিজ্ঞান, দর্শন, কলাও পড়েন। এতে দৃষ্টিভঙ্গি সবদিকে ছড়ায়। লেখায় ভিন্নতা আসে।

.

এখন সহজ ভাষায় কিছু সাধারণ ভুল শোধরাতে বলি,

১. গল্পে ডায়লগ হাইফেন (-) নয়, এম ড্যাশ (—), নতুবা উদ্ধরণ চিহ্ন (‘ ’ সিঙ্গেল অথবা ডাবল “ ”) ব্যবহার করুন। কখনই ওও কোনোভাবেই দুইটা মিশিয়ে লিখবেন না। তবে এম ড্যাশের চেয়ে উদ্ধরণ চিহ্ন বেশি উপযোগী।

অনেক সময় একটা সংলাপের মধ্যে আরেকটা সংলাপ থাকে। সেক্ষেত্রে যদি বাহিরের সংলাপে সিঙ্গেল ইনভার্টেড কমা ব্যবহার করি, তবে ভিতরেরটা ডাবল ব্যবহার করতে হবে। অথবা এর উল্টোটা। আর এই সমস্যা এড়াতেই এম ড্যাশ এড়িয়ে কমা ব্যবহার করা উত্তম।

২. বিরাম চিহ্নের পর স্পেস দিন। আগে নয় কখনই।

ব্যতিক্রম—
১. শুধুমাত্র কোলন ( : ) এর আগেপরে স্পেস দিতে হয়। কারণ আমাদের বিসর্গ (ঃ ) নামে একটা বর্ণ রয়েছে। এটার সাথে যাতে কোলন গুলিয়ে না যায় তাই এই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

২. স্ল্যাশ (/) এর আগে পরে কোনো স্পেস হবে না।

এম ড্যাশ (—) ব্যবহার হয় মূলত “এবং” এর পরিবর্তে বা দুটি বাক্যাংশে সংযোগ স্থাপনে।

৩. উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ গুলিয়ে ফেলবেন না। লেখার সময় খেয়াল করুন কোন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখছেন।

৪. গুরুচণ্ডালী দোষ মানে সাধুচলিতের মিশ্রণ অবশ্যই এড়াতে হবে। এজন্য ব্যাকরণবিদ হতে হবে না। তবে বেসিক জানা থাকতে হবে।

৫. বানানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য দিনরাত অভিধান চর্চার দরকার নেই। শুধু দরকার যখনই কোনো বানানে সংশয় জাগে ততক্ষণাৎ তা যাচাই করে নেওয়া। আর অভিধান সবসময় সর্বশেষ সংস্করণটা চর্চা করুন।

৬. অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি ভাষার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। আবার প্রয়োজনীয় ইংরেজি ভাষা ব্যবহার না করা থেকে বিরত থাকুন। যেমন,
চেয়ারটা কমফোর্টেবল না লিখে চেয়ারটা আরামদায়ক লেখাটা উত্তম।

আবার,
আমি তোমাকে মিস করছি।
এখানে “মিস” এর মানে যদিও শূন্যতা অনুভব করা, তবুও পরিপূর্ণ বাংলা প্রতিশব্দ নেই। তাই ভাব প্রকাশে মিস ব্যবহার শ্রেয়।

৭. দীর্ঘ বাক্য ও প্যারা পরিহার করুন। দুটোই পড়ায় ক্লান্তি আনে, তাই পাঠক আগ্রহ হারায়। ছোটো ছোটো বাক্য আর প্যারা লেখার সৌন্দর্য বাড়ায়।

৮. কী ও কি এর ব্যবহারে সচেতন থাকুন। হ্যাঁ বা না দিয়ে উত্তর দেওয়া গেলে “কি”, বাকিসব ক্ষেত্রে “কী” হবে।

৯. শব্দের পরের না-বোধক “না” সবসময় আলাদা এবং “নি” একসাথে হবে। যেমন, করি না, করিনি।

১০. “ও” আর “এবং” এর ব্যবহারে সতর্ক থাকুন।

#ও—দুইটি পদের মধ্যে সংযোগ ঘটায়।

#এবং—দুইটি বাক্য বা বাক্যাংশের মধ্যে সংযোগ ঘটায়।

১. চলো, আমি এবং তুমি একসাথে খেলি।

২. আমরা সেখানে গিয়েছিলাম ও তার সাথে দেখা করেছিলাম।

দুটো বাক্যেই সংযোজক অব্যয়ের ভুল ব্যবহার হয়েছে।

শুদ্ধ হবে,
১. চলো, আমি ও তুমি একসাথে খেলি।

২. আমরা সেখানে গিয়েছিলাম এবং তার সাথে দেখা করেছিলাম।

মনে রাখবেন, নিয়ম না জেনে নিয়ম ভাঙ্গা যায় না।

গল্প লিখুন, জগাখিচুরি নয়।

শুভকামনা রইল সবসময়।
(সংগৃহীত ও সংযোজিত)



Comments

Popular posts from this blog

মেয়েকে লেখা খতিব উবায়দুল হক রহ-এর চিঠি

শবে বরাত; মুক্তির রজনী